ভূমিকম্পের ৩নম্বর বিপজ্জনক জোনে কলকাতা, কি বলছেন ভূবিজ্ঞানীরা
কলকাতা: প্রকৃতির উপর ক্ষমতা জাহির করে লাভ নেই। তাই প্রকৃতির অনেক খামখেয়ালিপনার আগাম পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হলেও এখনো ভূমিকম্পের আগাম বার্তা দিতে পারেনি মানুষ। মাটির অতলে ভূস্থানিক প্লেট সরে যখন ঠোকাঠুকি খায় তখনই ভূমিকম্প হয়। দেখা যায় জলোচ্ছ্বাস।
বিজ্ঞানীদের মতে, ঝড়-বৃষ্টি, সুনামি, মহাজাগতিক ঘটনার আগাম বার্তা জানানো গেলেও ভূমিকম্পের আগাম সতর্কতা জারির কোন প্রযুক্তি নেই। কবে তা পাওয়া যাবে সেবিষয়েও কোন মত দিতে পারছেন না ভূবিজ্ঞানীরা। তবে কোনও দেশের কোন কোন এলাকা ভূকম্পপ্রবণ তার মোটামুটি একটা ধারণা পাওয়া যায়।
পড়ুন আরও- BreakingNews- গভীর রাতে শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল বাংলা
তবে ভূগর্ভের ঠিক কোন খানে দুই ভূস্থানিক প্লেটের সংঘর্ষ বা বিচ্যুতিতে ভূমিকম্প হবে তা বলা যাচ্ছে না। তবে ইন্ডিয়ান মেটারোলজিক্যাল ডিপার্টমেন্ট (আইএমডি), জিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া (জিএসআই),ন্যাশানাল জিওফিজিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মতো জাতীয় প্রতিষ্ঠানরা ভূমিকম্প ঘটার পরেই তা যন্ত্র দিয়ে মাত্রা মাপতে পারে। একই অবস্থা অন্য দেশের পরিবেশ সর্বেক্ষণ সংস্থাগুলিরও।
মাটির তলায় ‘জিওফিজিক্যাল সেন্সর’ বসিয়ে রাখা হয় ভূমিকম্প মাপার জন্য। ঐ সেন্সর মাটির কম্পনকে অনুভব করে যন্ত্রের মাধ্যমে কাগজে তা গ্রাফের আকারে এঁকে দেয়।এখনও ভূমিকম্পের প্রাবল্য মাপা হয় এই রিখটার এককে। ভূতাত্ত্বিকরা জানাচ্ছেন, বিশ্বের কোথাও না কোথাও প্রতিদিনই মাটি কেঁপে উঠছে। সেই কম্পন ১ থেকে ৩রিখটারের মধ্যে থাকলে সেটা তেমন ভাবে অনুভব করতে পারে না অতি বুদ্ধিমান মানুষ।

যদিও কিছু পোষ্য প্রাণী আশ্চর্যজনকভাবে ঐ কম্পনও অনুভব করে। দেশের কোনও গবেষণা সংস্থা ঐ কম মাত্রার ভূমিকম্পকে খতিয়ানের মধ্যে রাখে না। ৪রিখটারের বেশি ভূকম্পন হলে তা হিসাবে আনা হয়। আর মাটি কতক্ষণ ধরে কাঁপছে তার সারণি তৈরি করে কোন স্থান কতটা ভূকম্পন প্রবণ তার একটা ধারণা তৈরি করা হয়। স্থান-কালের ভিত্তিতে দেওয়া হয় সাবধানবাণী। সুনামির ক্ষেত্রে পূর্বাভাস দেওয়া যায়। কারণ সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস সুনামিতে পরিণত হতে কিছু সময় নেয়।
ভূমিকম্পের প্রাবল্য নিয়ে সমীক্ষা চালিয়েছে ব্যুরো অব ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ড (বিএসআই)। সেখানে ভূকম্পনের প্রবণতাকে ধরে ভারতকে পাঁচটি অঞ্চলে (জোন) ভাগ করেছে। সবচেয়ে বিপজ্জনক ৫নম্বর জোনে রয়েছে কাশ্মীর, পাঞ্জাব, গুজরাটের কচ্ছ, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো। অপেক্ষাকৃত কমজোরী ৪নম্বর জোনের মধ্যে পড়ছে উত্তরবঙ্গ এবং দক্ষিণবঙ্গের বেশির ভাগ জেলা। কলকাতা আর সংলগ্ন এলাকা রয়েছে ৩নম্বর বিপজ্জনক জোনের মধ্যে। ৩নম্বর জোনের মধ্যে পড়েও ভূতাত্ত্বিক বিশেষ গঠনের জন্য কলকাতায় ভূমিকম্পের প্রাবল্যটা ততটা বেশি হয় না। কারণ কলকাতার ভূমি ত্বকের নীচে রয়েছে পলিমাটির পুরু স্তর (সেডিমেন্টারি লেয়ার)। এই স্তরকে পার করলে আবারও ১৮-২০মিটার পর্যন্ত রয়েছে বালির স্তর। এটাই কলকাতার সুরক্ষা ব্যবস্থা।
কলকাতা থেকে হিমালয় পর্বতমালার দূরত্ব ৬০০কিলোমিটার। ভূমিকম্পের তরঙ্গ বয়ে আনার পক্ষে যদিও এটা কোনও নিরাপদ দূরত্ব নয়। কারণ ভূমিকম্পের জন্য জলস্তরের চাপ হঠাৎ বেড়ে গিয়ে তা মাটি ফুঁড়ে যখন তখন বেরিয়ে আসতে পারে। ভূগর্ভস্থ জলের ঐ চাপ মাটির উপরেরতল সহ্য করতে না পারলেই বাড়িঘর ভাঙার আশঙ্কা দেখা যায়। যেভাবে প্রতিনিয়ত কলকাতার ভূগর্ভস্থ জল তুলে নেওয়া হচ্ছে তাতে পলি স্তরের ওপর খুব খারাপ প্রভাব পড়ছে। তবে দিল্লি বা মুম্বইয়ের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ কলকাতা। দিল্লি অতি ভূকম্পপ্রবণ এলাকার মধ্যে পড়ে। মুম্বাই পড়েছে শিলা পুনর্গঠিত এলাকা (রিক্লেমড জোন) মধ্যে।
মাটির নীচের এই পলিস্তরের জন্যই কলকাতা অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক অবস্থায়। কিন্তু কলকাতার ঠিক পাশেই অবস্থিত সল্টলেকের অবস্থাটা জটিল৷ সল্টলেকের ভূস্থানিক অবস্থানটা অনেকটা মুম্বইয়ের মতো, এখানকার জমি প্রাকৃতিক নয় এবং বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয়ে থাকে পুনর্গঠিত (রিক্লেমড)। বালি ফেলে জলা জমি ভরাট করে কৃত্রিম ভাবে গড়ে তোলা হয়েছে সল্টলেকের ভূত্বক।ফলে স্বাভাবিক প্রাকৃতিক বুনট পেতে এখানে আরও কিছুটা সময় লাগবে। অন্যদিকে একের পর এক আকাশ ছোঁয়া বহুতল উঠে পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে । ফলে কলকাতা তুলনায় সল্টলেকে বেশি ভূমিকম্প অনুভব করা যায় ৷
ভূমিকম্পের জন্য বহুতলে বিপদের আশংকা থাকলেও জনবসতির চাহিদা মেটাতে কলকাতাতেও ইদানিং বহুতলের সংখ্যা বাড়ছে৷ দেখা গিয়েছে নতুন বহুতল নির্মানে মুম্বই এবং দিল্লির পরই রয়েছে কলকাতা৷ তবে দেখা গিয়েছে এই সব বহুতলের তুলনায় শহরে থাকা ব্রিটিশ আমলে গড়া অট্টালিকাগুলি তুলনায় বেশি নিরাপদ৷ আসলে ব্রিটিশ স্থাপত্য প্রযুক্তিতে যে বেলনাকৃতি পিলার ব্যবহার করা হয় তা সব ইট কেটে তৈরি। এগুলোর ভার বহনের ক্ষমতাও অনেক বেশি। একদিকে ইটের তৈরি প্রশস্থ ভারী দেওয়াল আর অন্যদিকে সুষম বিন্যস্ত ইটের বেলন পিলার। সব মিলিয়ে ছোট থেকে মাঝারি কম্পন সব ধরনের কম্পনকে হজম করতে পারে ইটের স্থিতিস্থাপক সংযুক্তি।
মাটির কাঁপুনি সহজে ফেলে না দিলেও দুলুনির চোটে ইটের উঁচু বাড়ি পড়ে যাওয়াটা বেশ কঠিন। কারণ মোটা মানুষকে নাড়ানো বা দোলানো রোগা মানুষের থেকে সহজ। অন্যদিকে, আধুনিক কংক্রিটের বহুতল গড়ে ওঠে শুধু লোহা-স্টোনচিপের খাঁচায়। আর লোহার কংক্রিটে একবার বড়সড় ফাটল হলে তা তাসের ঘরের মতো পড়ে যেতে বাধ্য। তাই দেখা যায় পুরনো ব্রিটিশ আমলের বাড়িগুলির তুলনায় শহরের নতুন বহুতলে ভূকম্পনের ফলে চিড় বা ফাটল বেশি ধরে৷ চওড়া দেওয়ালের ইটের বাড়ি উঁচুই হোক না কেন তা দোলে কম। অপরদিকে কংক্রিটের বহুতলে ঝাঁকুনিটা বেশি হয়। সেইজন্যই বহুতলের পাশ দিয়ে ভারী গাড়ি গেলে তার কাঁপ ধরে। একে ‘ডাম্পিং এফেক্ট’ বলে।
The post ভূমিকম্পের ৩নম্বর বিপজ্জনক জোনে কলকাতা, কি বলছেন ভূবিজ্ঞানীরা appeared first on Kolkata24x7 | Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading online Newspaper.
from Kolkata24x7 | Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading online Newspaper https://ift.tt/2yk2Uap
via IFTTT
Comments
Post a Comment