যমে মানুষে টানাটানি, মৃত্যুর মাহেন্দ্রক্ষণে সুখ খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি

সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: তিনি একাধারে শিশুসাহিত্যিক, অন্যদিকে বাংলা মুদ্রণের পথিকৃৎ। পাশাপাশি চিত্রকর, প্রকাশক, শখের জ্যোতির্বিদ, বেহালাবাদক ও সুরকার। কিন্তু উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরি এই নামটা বললেই সবকিছু সরিয়ে সর্বপ্রথম মনে আসে টুনটুনির গল্প কিংবা ছোটদের রামায়ণের মতো জনপ্রিয় শিশুসাহিত্যই। জীবনের শেষ ক্ষণেও তাঁর অবাক শিশু মনের পরিচয়ই মেলে। জীবন এবং মৃত্যুর মাঝের মুহূর্তে যে আনন্দের কোনও ক্ষণ থাকতে পারে তাঁর শেষমুহূর্তের কথা থেকেই জানা যায়।

গিরিডিতে উস্রী নদীর তীরে বেড়াতে যেতে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন উপেন্দ্রকিশোর। সময় পেলেই চলে যেতেন সেখানে। প্রচুর কাজ এবং ব্যস্ততার মধ্যে ক্রমশ শরীর ভেঙে পড়ছে। খেয়াল নেই কখন শরীরে বাসা বেঁধেছে মধুমেহ(সুগার) রোগ। একবার গিরিডিতে বেড়াতে গেলেন। জানতেন না সেটাই তাঁর শেষ যাত্রা হবে।

উঠেছিলেন ডঃ দ্বিজেন্দ্রনাথ মৈত্রের ‘রুবি লজ’ বাড়িতে। কিছুদিন থাকার পরেই শরীর খারাপ করতে শুরু করে। টানা দু’দিন রোগযন্ত্রণায় একদম অচৈতন্য হয়ে পড়েন উপেন্দ্রকিশোর। তাঁকে কলকাতায় নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত হয়। একপ্রকার জোর করেই ফিরিয়ে নিয়ে আসা হয় কলকাতায়।

আরও পড়ুন- নবাব সিরাজের বংশধর উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী

কনিষ্ঠ পুত্র সুবিমল রায় লিখেছেন, “বাবার অসুখ কিছুতেই সারছিল না, তাই তাঁকে কলকাতায় নিয়ে আসা হল। বড় বড় ডাক্তারেরা দেখলেন, কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না।” আসলে মধুমেহ বা সুগারের জন্য যে ইনসুলিনের প্রয়োজন হয় তখন তা আবিষ্কারই হয়নি। বিদেশ থেকে যে ওষুধ আসত, প্রথম মহাযুদ্ধের জন্য সেই ওষুধও আসা বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

পুত্র সুবিমল আরও লিখেছেন, “কঠিন অসুখের মধ্যেও বাবা শান্ত থাকতেন। বলতেন, “আমি খুব আনন্দে আছি।” যে দু-দিন অজ্ঞান-অচৈতন্য ছিলেন, সেই দুটো দিনও অস্ফুটে বলে যেতেন “সকল যন্ত্রণাবিমুক্ত হইয়া আমি কী আনন্দে বাস করিয়াছি, কী অমৃতের আস্বাদ পাইয়াছি তোমরা তাহা জানো না।’ মৃত্যুতে যে এমন আনন্দ-অভিজ্ঞতার রয়েছে তা তিনি নিজেই বলেছেন। পরে তাঁর সেই কথা লিখেছেন জ্যেষ্ঠ পুত্র সুকুমার রায়।

মৃত্যুর আগের দিন। রবিবার। ভোরবেলা। ছোট ছোট দুটো পাখি জানালার ধারে এসে কিচির-মিচির করছিল। মৃদুকণ্ঠে উপেন্দ্রকিশোর প্রায় বিড়বিড় করে বললেন, “পাখি কী বলে গেল তোমরা শুনেছ? পাখি বলল, পথ পা, পথ পা।’’

যত সময় এগোয় তত আশা কমে আসে বাংলার শ্রেষ্ঠ শিশু সাহিত্যিকের। আত্মীয়স্বজনেরা জড়ো হতে লাগলেন কলকাতার গড়পারের বাড়িতে। সোমবার ভোরবেলা উপেন্দ্রকিশোরের শেষশয্যার পাশে ঊষালোকে ব্রহ্মসঙ্গীত শুরু করলেন স্বজনেরা।

‘জানি হে যবে প্রভাত হবে, তোমার কৃপাতরণী লইবে মোরে ভবসাগরকিনারে’। তাঁকে নিয়ে লেখা বিভিন্ন লেখা থেকে জানা যায়, সেই গানের সঙ্গেও নাকি তখনও তাঁর মৃদুকম্পিত ঠোঁট দুটি যোগ রক্ষা করার চেষ্টা করছিল। বেশীক্ষণ মেলেনি সুর তাল। ২০ ডিসেম্বর আজকের এমন দিনেই থেমে যায় উপেন্দ্রকিশোরের হৃদকম্পন।

তথ্য : উপেন্দ্রকিশোরকে নিয়ে লেখা বিভিন্ন তথ্য ও তাঁর জীবনীমূলক বই

The post যমে মানুষে টানাটানি, মৃত্যুর মাহেন্দ্রক্ষণে সুখ খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি appeared first on Kolkata24x7 | Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading online Newspaper.



from Kolkata24x7 | Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading online Newspaper http://bit.ly/2T4QBau
via IFTTT

Comments