সুনামির জল সরতেই নবজন্ম এক মন্দির শহরের

সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন প্রাণ কাড়ে, তেমন অনেক ক্ষেত্রে দিয়ে যায় নতুনের জন্মও। সদ্য ইন্দিনেশিয়ার সুনামিতে মৃতের সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়েছে। ঘরছাড়া হাজার হাজার মানুষ। ১৪ বছর আগে সুনামির ধ্বংসলীলা দেখেছিল ভারত, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, মালদ্বীপ, মালয়েশিয়া এবং যথারীতি ইন্দোনেশিয়া। একদিকে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু মিছিল। অপরদিকে ‘নবজন্ম’ এক হারিয়ে যাওয়া মন্দির শহরের।

২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর সকাল ন’টা। স্থান মহাবলীপুরম সমুদ্রতট। মানুষ অবাক হয়ে দেখলেন সমুদ্রের জল সরে যাচ্ছে সমুদ্রতট থেকে। ধীরে ধীরে সমুদ্রের জল পিছিয়ে গেল প্রায় ৫০০ মিটার। উত্তাল সমুদ্র হঠাৎ নিস্তরঙ্গ। জলের তলায় এক হারিয়ে যাওয়া শহর হয়তো তখন মনে মনে হাসছে। সে বুঝতে পারছে এই শান্ত জল ধংসের আগমনী বার্তা কিন্তু তার নবজন্মের আগতও বটে।

যে সব জায়গায় জেলেরা মাছ ধরার নৌকো নিয়ে ঘুরে বেড়ায় সেখান থেকে জল সরে যাবার পর দেখা গেল পুরো জায়গাটা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে প্রাচীনযুগের কোন রহস্যময় স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ। তারপর শুধুই ধ্বংসলীলা। সমুদ্রগর্ভে ৯.৩ রিখটার স্কেলে মারাত্মক ভূমিকম্প। এবং বিশ্বের বহু মানুষের অভিধানে প্রবেশ নতুন শব্দ ‘সুনামি’-র। ৩৫ ফুট উঁচু সুনামির ঢেউ এসে ভাসিয়ে নিয়ে উপকূল থেকে শহর সবকিছু।

স্বজন হারানোর দুঃখ সামলে দক্ষিণ ভারতের মানুষ যখন কিছুটা স্বাভাবিক হল তখন মহাবলীপুরম শহরের বাকি মানুষেরা আবাক বিস্ময়ে দেখল যে সুনামির আঘাতে উপকূলের মানচিত্রটা গেছে আমূল পালটে। সমুদ্রের তলা থেকে জেগে উঠেছে বহু প্রাচীন ভাঙ্গাচোরা পাথরের দেওয়াল। এমনকি দৈত্যাকার ঢেউয়ের আঘাতে সমুদ্রের নীচে থেকে শ্যাওলায় ঢাকা পাথরের তৈরি এক বিরাট সিংহ মূর্তি এসে পড়ে রয়েছে সমুদ্রতটে। নোনতা জল সরিয়ে ‘নবজন্ম’ হারিয়ে যাওয়া কোনও এক শহরের। তখনও সাধারণ মানুষের কাছে পরিস্কার নয় এসব কি ? শুধুই অবাক হওয়া।

শুধু স্থানীয় জেলেদের কথায় জানা যেত আবহাওয়া পরিষ্কার থাকলে, সমুদ্র শান্ত থাকলে তারা যখন মাছ ধরতে সমুদ্রে নামে , তখন সূর্যের আলোয় পরিষ্কার দেখা যায় এক প্রাচীন কোনও শহরকে। বহু বছর যা ছিল গল্পকথা। সেটাই কি তাহলে এবার সবার সামনে ?

উত্তর মিলল ২০০৫ সালে আর্কিওলজি দফতর ওই অঞ্চলে অনুসন্ধান শুরু করার পড়ে। খোঁজ চলল সমুদ্রের তলাতেও। মেলে বিশাল অঞ্চল জুড়ে নানান স্তরে শ্যাওলা আর জলজ উদ্ভিদে ঢাকা অসংখ্য মন্দিরের টুকরো আর কারুকার্য করা পাথরখন্ড। প্রত্নতত্ববিদরা রিপোর্ট দিলেন, প্রায় ২৫০০ বছর আগেও ওই অঞ্চলে সত্যিই এক মন্দির শহর ছিল যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বন্দরও বটে। তাঁদের অনুমান, হাজার দেড়েক বছর আগে খুব অল্প সময়ের মধ্যে বেশ কয়েকটা শক্তিশালী সুনামির আঘাতেই শহরের একটা বিরাট আংশ ডুবে যায়। তারই ধ্বংসাবশেষ ছিল ওই মন্দিরের টুকরো।

স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী, মহাবলীপুরম শহরে জুড়ে ছিল অনবদ্য সাতটা মন্দির, যাদের স্থাপত্যকলা নাকি অভিভূত করত স্বয়ং দেবতাদেরও। দেবরাজ ইন্দ্র তাদের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন এবং ঈর্ষায় অন্ধ হয়ে তার আদেশে সমুদ্রের দেবতা তাদের মধ্যে ৬ টা মন্দিরকেই গ্রাস করে নেয় নিজের গভীরে। সৌন্দর্য আর অপরুপ ভাস্কর্যের মূর্ত প্রতীক হয়ে সমুদ্রতীরে দাড়িয়ে থাকে একটা মাত্র মন্দির – শোর টেম্পল। বহু বিদেশী পর্যটকদের লেখায় উল্লেখ মেলে ওই অঞ্চলের এক শহরের সাতটিা প্যাগোডার। এই নিয়ে আরও গবেষণা চলছে।

The post সুনামির জল সরতেই নবজন্ম এক মন্দির শহরের appeared first on Kolkata24x7 | Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading online Newspaper.



from Kolkata24x7 | Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading online Newspaper http://bit.ly/2GI6vWU
via IFTTT

Comments