পদ্মাপারে ভোট: অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রে সম্ভারে পার্বত্য চট্টগ্রামে রক্ত ঝরার আশঙ্কা

প্রসেনজিৎ চৌধুরী: দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলটি ঘেরা দুটি দেশের সীমান্ত দিয়ে৷ ভারত-মায়ানমার বেষ্টিত বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরেই বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন সক্রিয়৷ সেখানে ঘাঁটি তৈরি করে জঙ্গি ট্রেনিং ক্যাম্প চালাচ্ছে তারা৷

ত্রিদেশীয় এই আন্তর্জাতিক সীমান্ত এলাকাটি বাংলাদেশের আসন্ন একাদশতম জাতীয় নির্বাচনে বিশেষ চিন্তার৷ রীতিমতো অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের লেনদেন হয় এখানে৷ আর স্থানীয় কয়েকটি পাহাড়ি গোষ্ঠী নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু করায় প্রকাশ্যে খুন ও পাল্টা খুনের পর্বে কয়েকমাস আগেই বারে বারে রক্তাক্ত হয়েছে এই এলাকা৷

জাতীয় নির্বাচনের আগে তাই আন্তর্জাতিক সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় শুরু হয়েছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার অভিযান৷ ঢাকার কিছু সংবাদ মাধ্যমের রিপোর্ট, ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গত নয় মাসে বিভিন্ন প্রকারের মোট ১২০টি অবৈধ অস্ত্র, ১৩টি ম্যাগাজিন, ৯৭ রাউন্ড গুলি ও ২৬৭ রাউন্ড কার্তুজ উদ্ধার হয়েছে৷

এদিকে ঢাকায় সাংবাদিক সম্মেলন করে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাক্তন সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা সন্তু লারমা আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা করেন৷ তিনি বলেন, যে সশস্ত্র পথে প্রচুর মানুষের মৃত্যুর পরে শান্তি চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল, তার বাস্তবায়ন সম্পূর্ণ হয়নি৷ এতে ক্ষোভ বাড়বে৷ সন্তু লারমার মন্তব্য ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাড়া পড়েছে৷

পড়ুন:  শহিদ ভগৎ সিংকে ‘জঙ্গি’ বলে বিতর্কের মুখে অধ্যাপক তাজউদ্দিন

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই স্বশাসনের দাবিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকা উপজাতি ভিত্তিক সশস্ত্র আন্দোলনে রক্তাক্ত হতে শুরু করে৷ দীর্ঘ সশস্ত্র লড়াই এর পর পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি বাহিনীর সাথে বাংলাদেশ সরকারের শান্তিচুক্তি সই হয়েছিল ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর। তারপর পরা হয়েছে কুড়ি বছরেরও বেশি সময়। সেখানকার পাহাড়ি বাসিন্দা ও সন্তু লারমার অভিযোগ, চুক্তিতে যেসব অধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছিলো সেটা পূরণ করেনি কোনও সরকার৷

কী অবস্থা সেখানে?
পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, ও বান্দরবান হল অপূর্ব সুন্দর প্রাকৃতিক অঞ্চল৷ এই এলাকা পাহাড়ি উপজাতি গোষ্ঠীগুলি পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত৷ বিভিন্ন রিপোর্টে উঠে এসেছে গত নব্বই দশকের পর যেভাবে একের পর এক গোষ্ঠী ভিত্তিক সংঘর্ষে গত কয়েকমাস বারে বারে প্রকাশ্যে গণহত্যা বা পাল্টা খুনের পর্ব চলছে তা রীতিমতো উদ্বেগজনক৷ মোটামুটি দুটি প্রধান গোষ্ঠীতে বিভক্ত তারা৷ একটি হল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টকে (ইউপিডিএফ) ও তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী জনসংহতি সমিতির (এম এন লারমা) গোষ্ঠী৷ এই দুটি পাহাড়ি সংগঠন বহু বছর ধরে পরস্পরের নেতা ও কর্মীদের খুন করে চলেছে৷

শুধু উপজাতি ভিত্তিক সশস্ত্র সংগঠনই নয় দুটি আন্তর্জাতিক সীমান্ত এলাকা দিয়ে ঘিরে থাকা চট্টগ্রাম বিভাগের পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকায় শক্তিশালী ভারত ও মায়ানমারের জঙ্গি সংগঠনগুলি৷ একদিকে ত্রিপুরা, মিজোরাম অন্যদিকে মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশের মধ্যে তাদের অবাধ যাতায়াত হয়ে থাকে৷ রোহিঙ্গা সমস্যা তৈরি হওয়ার পরে রাখাইন প্রদেশে জমি শক্ত করেছে আরসা জঙ্গি সংগঠন৷ ভারত ও বাংলাদেশের গোয়েন্দা বিভাগ সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের দাবি, আরসা-কে মদত দেয় পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই৷ ফলে অস্ত্রের লেনদেন পার্বত্য চট্টগ্রামে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন গোষ্ঠীর কাছে নতুন কিছু নয়৷

বাম জমানায় ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় বিশেষ সক্রিয় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলি৷ তাঁর মন্তব্যের পর ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক নড়ে চড়ে বসে৷ পরে ঢাকা ও নয়াদিল্লির কূটনৈতিক তৎপরতায় দুই দেশের সীমান্ত এলাকায় শুরু হয়েছে বিশেষ নজরদারি৷

চলতি মাসেই জাতীয় নির্বাচন৷ ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে লাগোয়া ভারত ও মায়নামারের সীমান্তবর্তী এলাকায় শুরু হয়েছে বিশেষ অভিযান৷ এই অভিযানের প্রথম পর্বে উদ্ধার হয়েছে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র৷ নির্বাচনের সময় নাশকতা ঘটাতে মরিয়া হবে নব্য জেএমবি, জেএমবি, হিজবুত তাহরির, আনসার আল ইসলাম (আনসারুল্লা বাংলা টিম ) সহ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন৷

তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিতে বেআইনি অস্ত্র কারবারিরা সক্রিয়৷ তাই চট্টগ্রাম নগর ও পার্শ্ববর্তী এলাকার ৬টি আসন সহ মোট ১৬টি আসনের সবকটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে পুলিশ। চট্টগ্রামকে নিরাপত্তার বলয়ে মুড়ে দেওয়া হয়েছে৷ একদিকে বঙ্গোপসাগর অন্যদিকে পার্বত্য এলাকা হওয়ায় অস্ত্র পাচারকারীদের সুবিধা বেশি৷ তাই চট্টগ্রাম বন্দর-রেলস্টেশন, ষোলশহর রেলস্টেশন, পাহাড়তলি পাওয়ার স্টেশন সহ সর্বত্র জারি হয়েছে বিশেষ সতর্কতা৷

বাংলাদেশের চট্টগ্রামকে ঘিরেই একসময় উত্তর পূর্ব ভারতের অন্যতম বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন আলফা তার আগ্নেয়াস্ত্র পাচারের রুট গড়ে তুলছিল৷ তখন দেশটির ক্ষমতায় বিএনপি ও জামাত ইসলামি জোট৷ ২০০৪ সালের ১লা এপ্রিল বন্দর নগরী চট্টগ্রামের জেটিতে ১০ ট্রাক বিভিন্ন ধরণের অস্ত্র ও গোলাবারুদ পাচার হওয়ার আগেই ধরা পড়ে যায়৷ বাংলাদেশের ইতিহাসে ধরা পড়া অস্ত্র চোরাচালানের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ পরিমাণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

চাঞ্চল্যকর এই দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার অন্যতম আসামী তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর৷ বিচারে তাকে ফাঁসির সাজা দেওয়া হয়েছে৷ অন্যতম আরও এক আসামী তথা শীর্ষ জামাত ইসলামি নেতা মতিউর রহমান নিজামি৷ মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী অপরাধ মামলায় তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে৷ এই মামলায় অপর প্রধান অভিযুক্ত তথা বর্তমান আলফা (স্বাধীনতা) প্রধান পরেশ বড়ুয়াও ফাঁসির সাজা আসামী৷ যদিও অস্ত্র চোরা চালানের দিন চট্টগ্রাম থাকলেও পরে বাংলাদেশ ছেড়ে গোপন আস্তানায় চলে গিয়েছে এই বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা৷

নির্বাচনে পার্বত্য চট্টগ্রামকে রক্তপাতহীন করতে কোমর কষে নেমেছে পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনী৷

The post পদ্মাপারে ভোট: অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রে সম্ভারে পার্বত্য চট্টগ্রামে রক্ত ঝরার আশঙ্কা appeared first on Kolkata24x7 | Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading online Newspaper.



from Kolkata24x7 | Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading online Newspaper https://ift.tt/2E3JCev
via IFTTT

Comments