ভয়ঙ্কর আঘাতে ভ্যানিশ হচ্ছে বিখ্যাত বেড়ো পাহাড়
প্রসেনজিৎ চৌধুরী: সরকারি তালিকায় নথিভুক্ত থাকলেও সরকারি উদাসীনতার শিকার হয়ে ভ্যানিশ হয়ে যাবে বাংলার পর্বতারোহণের অন্যতম প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বেড়ো পাহাড়৷ দিনে দুপুরে পাহাড় চুরি হয়ে যাচ্ছে বাংলা থেকে৷ শুধু তাই নয় ধংস হয়ে যাচ্ছে অতি মূল্যবান জীবাশ্ম সামগ্রী৷ পরিস্থিতি এরকমই৷ তাই রুখে দাঁড়াচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা৷ আর প্রতিবাদীদের অনেকের বিরুদ্ধে ‘ফলস কেস’ দেওয়া হচ্ছে৷
সবাই জানে কারা হামলা চালায়৷ তাদের ছেনি-হাতুড়ির আঘাতে, পাথার কাটার শব্দে এলাকার নীরবতা বিদীর্ণ হয় প্রায়ই৷ আর এই ভয়ঙ্কর আঘাতে অদূর ভবিষ্যতে ভ্যানিশ হয়ে যাবে প্রকৃতির সম্পদ বেড়ো পাহাড়৷ ছোট বড় বেশকিছু পাথুরে জমি এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে৷ প্রকৃতির নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কিছু পাথর ব্যবসায়ীর নজরে পড়ে অচিরেই বিলুপ্তির পথে তারা চলে যাবে৷

পশ্চিম বর্ধমান ও পুরুলিয়ার মধ্যে বয়ে গিয়েছে দামোদর নদ৷ একপারে বার্ণপুর শিল্পাঞ্চল অন্যপারে প্রকৃতির অদ্ভুত রূপ ছড়িয়ে৷ আপনি যদি আসানসোল থেকে আদরা অভিমুখে ট্রেন সফর করেন তাহলে চোখ টানবে দু ধারের প্রকৃতি৷ রুক্ষু প্রান্তরের মাঝে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বেশ কিছু টিলা ও পাথর৷ দূরে বিহারীনাথ পাহাড়ের অবয়ব দেখে থমকে যাবে চোখের পাতা৷ এমনই সুন্দর প্রকৃতি পুরুলিয়ার৷ দামোদর সংলগ্ন এই এলাকার অতি উল্লেখযোগ্য একটি টিলা হল বেড়ো পাহাড়৷
সম্প্রতি স্থানীয় কয়েকজন ফেসবুকে এই বেড়ো পাহাড়ের দুর্গতি নিয়ে পোস্ট করেন৷ তারপর থেকেই এলাকায় পাথর ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আন্দোলন জমাট হতে শুরু করেছে৷ অভিযোগ, প্রকৃতির সম্পদকে রক্ষা করতে গিয়ে সেই আন্দোলনকারীদের কয়েকজনকে বিভিন্ন মামলায় জড়িয়ে দেওয়া হয়৷ যাতে তাঁরা প্রতিবাদ করতে ভয় পান৷ কয়েকটি ক্ষেত্রে পাথর ব্যবসায়ীরা সফল হলেও প্রতিবাদটা থেমে থাকেনি৷ সোশ্যাল সাইটে পুরুলিয়া সহ বাংলার অভিনব প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় তৎপরতা দেখা যাচ্ছে৷

পুরুলিয়ার বাঘমুণ্ডি, অযোধ্যা আর জয়চণ্ডী পাহাড় বিশেষ পরিচিত পর্যটকদের কাছে৷ ফলে সেখানকার পাথর চুরি করা কঠিন৷ কিন্তু জয়চণ্ডী পাহাড় লাগোয়া বেড়ো পাহাড় সেই অর্থে টুরিস্ট স্পট না হওয়ায় সেখানেই আঘাতটা এসেছে বেশি৷ স্থানীয় সাহিত্যিক গৌতম রায় জানিয়েছেন, বরাকর রোড ধরে ও বাঁকুড়া রোড বরাবর ছোট ছোট পাথার কাটার মেশিন চলছে৷ এই ব্যবসায়ীদের লক্ষ্য বেড়ো পাহাড়ের অতি উৎকৃষ্ট মানের গ্রানাইট পাথর৷ তারই লোভে অনবরত আঘাত করা হচ্ছে পাহাড়ের গায়ে৷ কয়েকটি ছোট অনামা টিলা ইতিমধ্যেই বিলুপ্ত৷ এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই মানচিত্র থেকে মুছে যাবে বেড়ো পাহাড় আর তার শিলা জৈবাশ্ম৷
ওয়েস্ট বেঙ্গল মাউন্টেনিয়ারিং ফাউন্ডেশনের সদস্য ও বর্ধমানের ‘ভ্রামণিক’ ক্লাবের পর্বতারোহী অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, যে বেড়ো পাহাড়ে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিতে গেলে সরকারের অনুমতি প্রয়োজন সেখানে কী করে পুরো পাহাড়টাই কাটার তাল করা হচ্ছে বা পাথার কাটার কাজ চলছে সেটাই অবাক করে৷ এরকম চলতে থাকলে আমরা পর্বতারোহণ সংক্রান্ত প্রশিক্ষণের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ স্থানকে হারিয়ে ফেলব৷

অপর পর্বতারোহী রমাপ্রসাদ কোলে জানিয়েছেন, বেড়ো পাহাড়ের উপর আঘাতের খবরটা শুনে হতাশ লাগছে৷ কোন অবস্থায় এলাম আমরা৷ শুধু পর্বতারোহণের প্রাথমিক পর্বই নয়, পাতার কটার কাজ হতে থাকলে স্থানীয় ভূ প্রকৃতিতে বড়সড় আঘাত নেমে আসতে চলেছে৷ পাহাড় ধংস হলে ক্ষতি হবে বাংলার পর্বতারোহণ শিক্ষারও৷ বিভিন্ন সময়ে বিশেষ করে শীতের মরসুমে বেড়ো-জয়চণ্ডীর পাথুরে এলাকায় বিভিন্ন ক্লাবের তরফে চালানো হয় রক ক্লাইম্বিং ও ট্রেকিং কোর্স৷ এই ধরমের টিলা সেই শিক্ষায় অত্যন্ত উপযোগী বলে জানিয়েছেন
বেড়ো এলাকার গ্রাম বাগিচা৷ সেখানকারই চণ্ডী পাহাড়ের উপর আঘাত এসেছে সবথেকে বেশি৷ সোশ্যাল সাইটে প্রথম বিষয়টি উঠে আসে৷ এরপর শুরু হয় বিতর্ক৷ বেড়ো স্থানীয় লোকসংস্কৃতি ও মন্দির গবেষক ড. সুভাষ রায় জানালেন পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগজনক৷ এখান থেকে বড় বড় পাথারের চাঁই বাইরে পাচার হচ্ছে৷ এই পাথরের সঙ্গে জড়িয়ে স্থানীয় ভূ-বৈচিত্র৷ এসব নিয়ে গবেষণা তো দূরের কথা সেটাকে ধংস করে চটজলদি টাকা কামানোর উপায় করেছে কিছু ব্যবসায়ী৷
স্থানীয় অনেকেরই অভিযোগ, প্রশাসনের নাকের ডগায় যেভাবে পাহাড় চুরি হচ্ছে তাতে প্রশ্ন উঠে যায় প্রশাসনিক কর্তা ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়েও৷ বেড়ো পাহাড় চুরি করে নেওয়ার বিষয়ে পুরুলিয়া জেলা প্রশাসনের উদাসীনতাকেই দায়ী করছেন অনেকে৷
আরও পড়ুন : ইস্তফা দেওয়ার পর বন্ধু বৈশাখীকে নিয়ে প্রকাশ্যে শোভন
টিলা-পাহাড়ের এই এলাকাটি পড়ে রঘুনাথপুর-১ ব্লকের অধীনে৷ এখানকার জমির উর্বরতা ইর্ষনীয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা৷ বেড়ো সংলগ্ন কয়েকটি প্রাকৃতিক জলা এলাকায় যে চাষ হয় তার উৎপাদনশীলতা নির্ভর করছে পাথুরের জমির কারণেই৷ পাহাড়টি কেটে টুকরো করে নিলে কৃষিতেও বিপুল ক্ষতির আশঙ্কা থাকছে৷
স্থানীয় কবি বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় জানিয়েছেন সম্প্রতি হোয়াটস অ্যাপে বেড়ো পাহাড়ের অবস্থা নিয়ে একটি লেখা পড়ি৷ এটি লিখেছেন অমূল্য ত্রিবেদী৷ তাঁর লেখা পড়ে ও সেখানকার পরিস্থিতি দেখে মনে হয়েছে পরিবেশ রীতিমতো বিপন্ন৷ সেই পোস্টে লেখা হয়েছে-‘ মূল্যবান গ্রানাইট পাথরের লোভে গোটা পাহাড়টাই কাটা হচ্ছে৷ পাহাড়ের একটা অংশ প্রায় কেটে সাফ করা হয়ে গেছে অলরেডি। পাহাড় কেটে বড় বড় পাথরের চাঁই জড়ো করে রাখা হয়েছে। আধুনিক মেশিনপত্র লাগিয়ে রীতিমত ক্যাম্প বানিয়ে পাহাড় কাটার কাজ চলছে। এই খনন বৈধ না অবৈধ জানা নেই, প্রশাসনিক সম্মতিতে না অসম্মতিতে জানা নেই, সরকারী মদতে না নিস্পৃহতায় জানা নেই, সব কিছু ধোঁয়াশা। খনন বৈধ হলেও বৈধতার মাপকাঠি কি?’
The post ভয়ঙ্কর আঘাতে ভ্যানিশ হচ্ছে বিখ্যাত বেড়ো পাহাড় appeared first on Kolkata24x7 | Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading online Newspaper.
from Kolkata24x7 | Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading online Newspaper https://ift.tt/2raggCy
via IFTTT
Comments
Post a Comment