ভোটবাগানে নেই কোনও ভোট, ‘মহাকালের’ গহ্বরে লুকিয়ে সন্ন্যাসীর কূটনীতির গল্প

সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : ভোটবাগান, কিন্তু সেখানে কোনও ভোট নেই। লুকিয়ে রয়েছে অন্য এক গল্প। সে গল্প এক কূটনীতিকের, সেই কাহিনী এক হিন্দু-শৈব সন্ন্যাসীর। ইতিহাস বলছে, তিব্বতের সঙ্গে ভারতের এক অজানা সম্পর্কের কথা লুকিয়ে রয়েছে হাওড়ার ভোটবাগানের প্রায় ১৫০ বিঘা জমির উপর মন্দিরের অন্দরে, যার যোগসূত্র গড়েছিলেন ওই কূটনীতিক তথা সন্ন্যাসী। তিনি পুরাণগিরি সন্ন্যাসী।

তিব্বতের দলাই লামা নিয়ে আজও ভারতের সঙ্গে চিনের সম্পর্ক ভালো নয়। ২৫০ বছর আগেও ভালো ছিল না। তবে মাঝে তখন কোনও দলাই লামা ছিলেন না। চিনের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো ছিল না ভারত দখল করে নেওয়া ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে। তিব্বতের মাধ্যমে কোম্পানির চিনে ব্যবসা করার রাস্তা করে দিয়েছিলেনে সন্ন্যাসী কূটনীতিক পুরানগিরি।

সেই সময় তিব্বত এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, দুজনেরই ব্যবসা বাড়ানোর তাগিদ ছিল। হেস্টিংস চাইছিলেন চিনের পশ্চিম দিকে ব্যবসা করতে, কিন্তু চিনে ব্যবসা করতে বাধা ছিল কোম্পানির মাথাদের। তাই তিনি চাইছিলেন তিব্বতের সঙ্গে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসায়িক গাঁটবন্ধন হোক। তাহলে তিব্বতের মাধ্যমে ঘুরপথে চিনের পশ্চিম দিকে ব্যবসা শুরু করা যাবে।

এদিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসা বলে কথা, তিব্বতের শাসক লামা পাঞ্চেন হেস্টিংসের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান। এরপরেই আগমন সেই কূটনীতিক তথা হিন্দু শৈব সন্ন্যাসী পুরাণগিরির। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পুরানগিরিসহ একটি ব্রিটিশদলকে তিব্বতে পাঠিয়ে দিলেন। তিব্বতের শাসক ব্রিটিশদলকে আশ্বাস দেন যে তিনি চিনের পিকিংয়ে ব্যবসার জন্য সে দেশের সম্রাটের সঙ্গে কথা বলে একটি ভূ-গর্ভস্থ পথ দিয়ে পাসপোর্টের ব্যবস্থা করে দেবেন।

আসলে তিব্বতের মানুষ পুরানগিরিকে অত্যন্ত পছন্দ করতেন। তাই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে মধ্যস্থতায় কোনও সমস্যার তৈরি হয়নি। এদিকে ব্যবসার ওই পথের বদলে তিব্বত তার দেশের বৌদ্ধভিক্ষুদের ভারতে ব্যবসা বানিজ্য করার জন্য ভাগীরথীর পশ্চিম দিকে একটি থাকার জায়গা ব্যবস্থা করে দিতে আবেদন জানায়। এই জায়গার ব্যবস্থা করে দেওয়ার দায়িত্বও দেওয়া হয়ে সেই পুরানগিরিকেই।

হেস্টিংস হাওড়ার ঘুসুরিতে প্রথমে ১০০ বিঘা পরে বাড়িয়ে ১৫০ বিঘা জমি দান করেন তিব্বতিদের। ফলক অনুযায়ী ১১৮৯ বঙ্গাব্দে তৈরি হয় তিব্বতিদের থাকার বিশাল জায়গাটি। সামনে বাগানের জন্য একটি বড় অংশ ফাঁকা রাখা হয়েছিল। তিব্বতি সাধুদের জন্য তৈরি মঠ বা স্থানকে বলা হয় ভোট। সেই ভোট এবং বাগান মিলিয়ে জায়গার নাম হয় ভোটবাগান এবং মঠ পরিচিতি পায় ভোটবাগান মঠ নামে।

তবে এই মধুর সম্পর্কের শুরু আরও কিছু আগে। যার মূলে ছিলেন পুরানগিরি। ১৭৭১ সালে কোচবিহার আক্রমণ করেছিলেন ভুটানের রাজা। হার বাঁধা , তাই কোচবিহারের রাজা ধরেন্দ্রনারায়ণ সাহায্য চান ইংরেজদের কাছে। রাজাকে রক্ষা করতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এগিয়ে আসে। এবার যুদ্ধে ভুটান রাজের হার প্রায় নিশ্চিত। চাপের মুখে পড়ে ভুটানের রাজা তিব্বতের শাসক তৃতীয় পাঞ্চেন লামা লবসং পালডেনহের সাহায্য চেয়ে চান।

জম্পেন গায়টো অর্থাৎ অষ্টম দলাই লামা, তখন নেহাতই বালক তাই শাসক হিসাবে কাজ করতেন পাঞ্চেন লামাই। তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বড়লাট ওয়ারেন হেস্টিংসকে যুদ্ধ থামিয়ে একটি শান্তি ফেরানোর জন্য চিঠি পাঠান। কলকাতায় তাঁর দূত হিসাবে পাঠিয়েছিলেন পুরাণগিরি সন্ন্যাসীকে। তাঁর হস্তক্ষেপে মান বাঁচে ভুটান রাজের, আবার ভারত শাসন করা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে সম্পর্ক ভালো হয় তিব্বতের। এই শান্তি চুক্তিই ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে এক করেছিল তিব্বত ভারতকে। যার নেপথ্যে পুরানগিরি সন্ন্যাসী।

১৭৯৫ সালে নদীপথে ডাকাতদের হামলা হয় মঠে। তলোয়ার নিয়ে পুরাণগিরি ডাকাতদের মোকাবিলা করেন। কিন্ত আচমকা ডাকাতদের বল্লমের আঘাতে গুরুতর জখম হয়ে মৃত্যু হয় সন্ন্যাসী তথা কূটনীতিকের। পুরাণগিরির মৃত্যুর পরও বহুবছর গরিমা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল এই মঠে। কিন্তু স্বাধীনতার পর নানা কারণে মঠে প্রশাসনিক শিথিলতা গ্রাস করে। মঠের বিপুল সম্পত্তির অনেকটাই বেদখল হয়ে যায়। এমনকী মহাকালের মূর্তি চুরিরও চেষ্টা হয়৷

বহু বছর হাওড়া জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে জেলা ট্রেজারিতে সুরক্ষিত রাখা ছিল ভোটবাগান মঠের যাবতীয় মূর্তি ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিস। বছর খানেক আগে আদালতের নির্দেশেই ট্রাস্টি তৈরি করে ৭ জনের এক কমিটির হাতে মঠ পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়। হাওড়ার জেলা বিচারকের দুই প্রতিনিধি, সংস্কৃত-সাহিত্য সমাজের এক প্রতিনিধি, হাওড়া পুর নিগমের এক প্রতিনিধির উপর দায়িত্ব বর্তায় মঠ পরিচালনার। মহাকালের মূর্তি ফিরিয়ে এনে পুজো ও অন্যান্য আচার-অনুষ্ঠান শুরু হয়।

বৌদ্ধ মঠ হলেও এটি হিন্দু মন্দিরের আদলে গঠিত। একই সঙ্গে শৈব, হিন্দু দেবদেবীর সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের পূজ্যদেরও অধিষ্ঠান হয়েছিল ভোটবাগান মঠে। মঠে বিষ্ণু, দুর্গা, বিন্ধ্যবাসিনী, গণেশ, গোপাল, শালগ্রাম, শিবলিঙ্গ প্রভৃতির সঙ্গে তারা, মহাকাল, পদ্মপাণি, বজ্র ভ্রূকুটি- এই সব বৌদ্ধ তান্ত্রিক দেবদেবীরাও পূজিত হতেন। আজও একইসঙ্গে বিরাজমান মহাকাল এবং বিভিন্ন হিন্দু দেবদেবী। রয়েছে ২০০৬ সালে বসানো রাজ্য হেরিটেজ কমিশনের বোর্ড। তবে সংরক্ষণের অভাব স্পষ্ট। বাড়ির চারিদিকে বিশাল বট-অশ্বত্থ শিকড়। সিঁড়ি থেকে ছাদ ভয়ঙ্কর ভগ্ন অবস্থা।

ভোটের আগে চলুন ঘুরে আসি ভোট বাগানে

Kolkata24x7 यांनी वर पोस्ट केले बुधवार, २७ मार्च, २०१९

The post ভোটবাগানে নেই কোনও ভোট, ‘মহাকালের’ গহ্বরে লুকিয়ে সন্ন্যাসীর কূটনীতির গল্প appeared first on Kolkata24x7 | Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading online Newspaper.



from Kolkata24x7 | Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading online Newspaper https://ift.tt/2YwNPhN
via IFTTT

Comments