‘‘মোদীবাবু এক সময় মুসলিমদের টুপি পরতে চাননি আজ তিনি মসজিদে-দরগায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন’’
ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের হাত ধরে রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়েছে তার৷ রাজনীতিতে কাটিয়ে ফেলেছেন প্রায় ৪০ বছর৷ কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্কও ছিন্ন হয়েছে৷ তৃণমূলের সাংসদ হিসেবে কাটিয়ে ফেলেছেন প্রায় সাড়ে চার বছর৷ এই লম্বা রাজনৈতিক জীবনে একাধিকবার বিতর্কে জড়িয়েছেন৷
সাংসদ তহবিলের টাকা খরচের রেকর্ড গড়ে প্রশংসাও কুড়িয়েছেন৷ বসিরহাটের সাংসদ ইদ্রিস আলি কিন্তু তার সমস্ত কৃতিত্ব দিচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই৷
লোকসভা নির্বাচন-মুখী পশ্চিমবাংলায় ধর্মীয় টানাপোড়েন, বিজেপির উত্থান, রথযাত্রা, তিন তালাক থেকে ববি হাকিমের কলকাতা পৌরসভার মেয়র হওয়া সব কিছু নিয়ে সোজাসাপ্টা সাক্ষাতকার দিলেন Kolkata24x7-এর প্রতিনিধি শেখর দুবেকে৷

প্রশ্ন: আপনি কলকাতা সেন্ট পলসের ছাত্র ছিলেন৷ সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে আইন পড়েছেন সেখান থেকে সোজা ক্ষমতার অলিন্দে৷ কিভাবে দেখছেন প্রায় ৫ বছরের সাংসদ পদে থাকার সময়টাকে?
ইদ্রিস আলি: সাংসদ হওয়ার আগে থেকেই আমি রাজনীতিতে রয়েছি৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ঈশ্বরের কৃপায় আমি আজ এই জায়গাতে৷ উনি আমাকে জিতিয়ে না আনলে আমি এই জায়গাতে থাকতাম না৷ আমি ওনার কাছে কৃতজ্ঞ৷ এই পাঁচটা বছর বসিরহাটের মানুষের জন্য কাটালাম৷ এখনও তাদের উন্নয়নের কথাই ভাবি৷
প্রশ্ন: এই বছর সেপ্টেম্বরের জানা যায় বাংলার পাঁচজন সাংসদ, দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ‘‘সাংসদ তহবিলের টাকার’’ ব্যবহার করে নজির গড়েছেন৷ কী বলবেন?
ইদ্রিস আলি: আমি চেষ্টা করেছি কাজ করার৷ বলা ভালো আমরা সবাই মিলে কাজ করেছি৷ তাতেই এই সাফল্য৷ যে আমার কাছে এসেছে যে যে রকমের সাহায্যের আবেদন নিয়ে আমি পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি৷ ক্যানসার রুগীদের টাকা দিয়ে সাহায্য করেছি৷
প্রশ্ন: ২০১৪ থেকে ২০১৮ বসিরহাটের বিধায়কের দায়িত্ব সামলালেন৷ এমন কোন কাজ এখনও বাকি আছে যেটা বসিরহাটের মানুষের জন্য করতে চান?
ইদ্রিস আলি: এখনও প্রচুর কাজ বাকি রয়েছে৷ আমাদের দলনেত্রীর অধীনে এভাবেই মানুষের জন্য কাজ করতে চাই৷
প্রশ্ন: ইদ্রিস আলি কী আবার বসিরহাট থেকেই লোকসভা নির্বাচন লড়তে চলেছেন?
ইদ্রিস আলি: দেখুন এব্যাপারে যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার দল নেবে৷ আমি তো বললামই আমি মানুষের জন্য কাজ করতে চাই৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি আবার আমাকে এই দায়িত্ব দেন নিশ্চয় লড়ব৷
প্রশ্ন: ববি হাকিম মেয়র হয়েছেন৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে স্বাধীন ভারতে প্রথম মেয়র পদে বসেছেন কোন মুসলিম নেতা৷ কী বলবেন?
ইদ্রিস আলি: বাংলায় এক সম্প্রীতির পরিবেশ তৈরি করেছেন আমাদের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী৷ উনি বাংলার হিন্দু-মুসলিম সবার উন্নয়নের জন্য কাজ করছেন৷ সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করছেন৷ এর আগে বাংলায় এরকম পরিস্থিতি ছিল না৷ ববিকে শুভেচ্ছা৷
প্রশ্ন: এর আগে সিপিএম সরকার দাবি করত তারা সংখ্যালঘুদের জন্য কাজ করেছে৷ কিন্তু ৩৪ বছরের বাম শাসনেও কোনও মুসলিম নেতা মেয়র হননি৷ কী বলবেন?
ইদ্রিস আলি: এদের নিয়ে যত কম বলা যায় ততই ভালো৷ ওরা তো বাংলার সংখ্যালঘুদের সঙ্গে বিজেপির থেকেও খারাপ আচরণ করেছে৷ ওদের নিয়ে কিছু বলতে চাই না৷
প্রশ্ন: RSS VHP ববি হাকিমের মেয়র হওয়ার বিরোধীতা করেছে কী বলবেন?
ইদ্রিস আলি: কেন বিরোধীতা করছে ওদেরই জিজ্ঞেস করুন৷ পুরো বাংলায় অশান্তি ছড়াতে চাইছে বিজেপি৷ হিন্দু মুসলিমের মধ্যে অশান্তি ছড়িয়ে বিভেদ করতে চাইছে৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সবাইকে সঙ্গে নিয়ে উন্নয়ন করছেন তাই এদের গায়ে এত জ্বালা৷
প্রশ্ন: ২০০৭ সালে তসলিমার বিরোধীতায় পার্কসার্কসে অশান্তি তৈরি হয়৷ আপনাকে ওই সময় আটকও করে পুলিশ৷ তসলিমার কলকাতা ছাড়া হওয়ার পেছনে আপনার অবদান সবচেয়ে বড় বলে বিরোধীদের দাবি৷ কী বলবেন?
ইদ্রিস আলি: অশান্তি, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এসব সংবাদ মাধ্যমের দেওয়া নাম৷ ওখানে সেদিন সাধারণ মুসলিমরা আন্দোলনে নেমেছিল৷ তসলিমা আমাদের নবীর নামে যে সব অসত্য নোংরা কথা বলেন তার বিরোধীতা তো হবেই৷ ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা নবীর নামে অসত্য বরদাস্ত করে না৷
প্রশ্ন: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সময় রাজ্যে কি সংখ্যালঘুরা সত্যিই ভালো আছেন বলে মনে করেন?
ইদ্রিস আলি: নিশ্চয়৷ আগের তুলনায় এখন সংখ্যালঘুরা অনেক ভালো আছেন৷ এখনও উন্নতি প্রয়োজন৷
প্রশ্ন: তৃণমূল সরকারের সময় কিন্তু আসানসোলের ইমাম তার অল্প বয়সী পুত্রের মৃতদেহ নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছে?
ইদ্রিস আলি: এটি একটি খুবই দুঃখজনক ঘটনা৷ বিজেপি, আরএসএস এসব করিয়েছে৷ আমাদের নেত্রী সংখ্যালঘুদের ভালো চান৷ এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার জন্য তৃণমূল সরকারের দিকে আঙুল তুলে লাভ নেই৷
প্রশ্ন: আপনি বলছেন মুসলিমরা ভালো আছেন৷ তরুণ মুসলিম নেতা কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে কিন্তু বড় সংখ্যায় মুসলিম মানুষজন ইমামভাতা বাড়ানোর মত একাধিক দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমে মমতা সরকারের বিরোধীতা করেছেন!
ইদ্রিস আলি: দেখুন ওদের কিছু দাবী ছিল৷ ওরা সেগুলো বলেছে৷ মুক্ষ্যমন্ত্রী সবার কথা ভাবেন৷ এটা নিয়েও ভাববেন৷ তবে এভাবে না করে সোজাসুজি দিদির কাছে গিয়ে ওনাকে বললে উনি নিশ্চয় অনুরোধ রাখতেন বলে আমি মনে করি৷
প্রশ্ন: আপনি হয়ত এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সোজাসাপ্টা দিতে পারবেন না৷ কিন্তু একজন আইনের লোক হিসেবে আপনি বোধহয় সবচেয়ে ভালো বলতে পারবেন মোদী সরকারের ‘তিন তলাক’ অর্ডিন্যান্স নিয়ে৷
ইদ্রিস আলি: (হাসি) এটা ভোটের রাজনীতি৷ আজ লোকসভা ভোটের আগে হঠাৎ করে দেশের প্রধানমন্ত্রী মুসলিম দরদী হয়ে উঠলেন! যিনি এক সময় সর্বসম্মুখে মুসলিমদের টুপি পরতে চাননি আজ তিনি মসজিদে-দরগায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন৷ উনি হঠাৎ করে মুসলিম মেয়েদের কথা ভেবে ‘তিন তালাক’ অর্ডিন্যান্স নিয়ে চলে এলেন৷ এসব চালাকি মুসলিমরা বোঝে এভাবে উনি সংখ্যালঘুদের ভোট পাবেন না৷
প্রশ্ন: সত্যি মনে করেন ‘তিন তলাক’ মুসলিম মেয়েদের জন্য ভালো? কিংবা মুসলিম মেয়েদের জন্য এটা অভিশাপ নয়?
ইদ্রিস আলি: খারাপ-লোক সব ধর্মেই রয়েছে৷ মুসলিম ধর্মেও আছে, যারা ‘তিন তালাক’ প্রথার অপব্যবহার করেন৷ আমি যে কোনও জলসায় গেলে বলি এবিষয়ে৷ কোরাণে কোথাও তিন তালাকের সমর্থনে কিছু বলা নেই৷ আর ওই ভাবে ফোনে তিনবার তালাক, তালাক , তালাক বলেই তালাক হয়ে যায় না৷
প্রশ্ন: তাহলে মোদী সরকার ‘তিন তলাক’ বিলকে সমর্থন করেন? এই বিল আনার কৃতিত্ব কী মোদীর প্রাপ্য নয়?
ইদ্রিস আলি: আমি তো আগেই বলেছি এসব ভোট রাজনীতির চালাকি৷ আজ অবধি কটা সংখ্যালঘু মেয়েকে চাকরি দিয়েছে মোদী সরকার? ওরা কারও ভালো চায় না৷
প্রশ্ন: বিজেপির দাবী এই ‘তিন তালাক’ বিল সহ একাধিক বিষয়ে মুসলিমদের উন্নতি ঘটানোর চেষ্টা করেছে তারা৷ তাই সারা ভারতে মুসলিমরা তাদের ভোট দেবে৷ বাংলায়ও ৩০ শতাংশ মুসলিম ভোটের সিংহভাগ পেয়ে থাকে তৃণমূল৷ এবার সেই ভোটেই থাবা বসাতে চলেছে বিজেপি?
ইদ্রিস আলি: সেই আশাতেই তো এসব করছে৷ কিন্তু মুসলিমদের একটিও ভোটও বিজেপি পাবে না৷ মুসলিমরা চেনে কে বন্ধু কে শত্রু৷ আমাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর কাছ থেকে সম্প্রীতি শেখা উচিৎ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর৷
প্রশ্ন: আপনি, ববি হাকিম, জাভেদ খান, পশ্চিমবঙ্গে অনেক সংখ্যালঘু নেতাই কিন্তু রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন৷ আপনি নিজেই বললেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজত্বে ভালো আছেন সংখ্যালঘুরা৷ আমাদের প্রতিবেশি দেশ বাংলাদেশে কিন্তু সংখ্যালঘু হিন্দুরা ঘর ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন মাঝে মাঝেই৷ কী বলবেন এটা নিয়ে?
ইদ্রিস আলি: এটি অন্য দেশের বিষয়৷ আমি সাংবাধানিক পদে রয়েছি আমার এবিষয়ে কিছু বলা ঠিক হবে না৷
প্রশ্ন: বেশ কিছুদিন আগে আপনি মহম্মদ আলি জিন্নার পাশাপাশি সর্দার প্যাটেলকেও দেশ বিভাগের জন্য দায়ি করেছিলেন৷ বিজেপি গুজরাটে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্যাটেলের ‘স্ট্যাচু অফ উইনিটি’ বানিয়েছেন৷ কীভাবে দেখছেন বিষয়টাকে?
ইদ্রিস আলি: দেশে কাজ নেই৷ যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল সেই সব ১৫ লাখ কোথায় গেল? কোটি কোটি টাকা খরচ করে আবার মুর্তি বানাচ্ছে৷ কী বলব বলুন! এ তো প্যাটেল, কিন্তু বিজেপি তো গান্ধী হত্যাকারী গডসেরও মন্দির বানিয়ে পুজা করে৷
প্রশ্ন: বিজেপি রথযাত্রা করার অনুমতি চেয়েছে৷ রথ নিয়ে কী বলবেন?
ইদ্রিস আলি: যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এটা বন্ধ করানো উচিৎ৷ এর মাধ্যমে অশান্তি ছড়িয়ে বাংলার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে চাইছে বিজেপি৷ তবে শেষ সিদ্ধান্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেবেন৷ ওনার সিদ্ধান্তই শেষ কথা৷
The post ‘‘মোদীবাবু এক সময় মুসলিমদের টুপি পরতে চাননি আজ তিনি মসজিদে-দরগায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন’’ appeared first on Kolkata24x7 | Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading online Newspaper.
from Kolkata24x7 | Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading online Newspaper https://ift.tt/2DGhAEI
via IFTTT
Comments
Post a Comment