শ্যামসুন্দরের পালকি বওয়ার জন্য আজও তাঁতীদের কাছে চিঠি যায়…

তিমিরকান্তি পতি, বাঁকুড়া: সালটা ছিল ৯৮২ – ১০৭৯ বঙ্গাব্দ। প্রভু শ্যামসুন্দরের লীলায় গঙ্গাস্নান যাত্রার পথে রাজা জগন্নাথ ঢোল সাক্ষাৎ পেলেন এক দিব্যমূর্তি ব্রাহ্মণ গোস্বামীর। সেখান থেকেই শুরু এক অধ্যায়ের৷ সেই থেকেই প্রাচীন রাসযাত্রার শুরু হল বাঁকুড়ায়৷ প্রায় চারশো বছরের প্রাচীন এই রাস উপলক্ষ্যে দূর দূরান্ত থেকে মানুষ ভিড় করেন বাঁকুড়ার ইন্দপুরের ব্রজরাজপুর গ্রামে।

এখানকার শ্রী শ্রী শ্যামসুন্দর জিউর রাস যাত্রার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, রাস মধ্যম রাস। যা বৃন্দাবান বা নবদ্বীপের রাসযাত্রার পরের দিন শুরু হয়। অর্থাৎ প্রতিপদ তিথিতে। সেই হিসেবে এই বছর শনিবার রাত থেকেই শুরু হয়ে গেল ব্রজরাজপুর গ্রামের শ্রী শ্রী রঘুনাথ জিউর রাস যাত্রা।

কথিত আছে, অপুত্রক ধল্লরাজ খাতড়া তথা সুপুরের রাজা জগন্নাথ ঢোল, সন্তান সুখ থেকে বঞ্চিত থাকার কারনে বিষাদগ্রস্ত হয়ে তাঁর পরগনার ভার ভাইপোকে দিয়ে সংসার ছেড়ে গঙ্গাস্নানে বেরিয়ে যান। বাড়ি থেকে গঙ্গা অনেক অনেক দূর। কয়েক দিনের হাঁটা পথ। পথে সেই সময় বিষ্ণুপুরের রাজা মল্লারাজ হান্বির মল্লের আতিথ্য গ্রহণ করেন তিনি। বোলাড়া গ্রামে রাজারই তৈরী করে দেওয়া মন্দিরে, শ্যামসুন্দরকে প্রতিষ্ঠা করেন শ্রীদাস গদাধর৷ সেই সময় শ্যামসুন্দরের সেবায় নিয়োজিত ছিল গদাধরের পৌত্র মথুরানন্দ গোস্বামী।

মথুরানন্দের সঙ্গে গঙ্গাস্নান যাত্রার পথে, রাজা জগন্নাথ ঢোলের সাক্ষাৎ হয়৷ রাজা নিজের কষ্টের কথা তাঁকে সব খুলে বললেন৷ মথুরানন্দ তাঁকে আশ্বাস দিয়ে বলেন প্রভুই মঙ্গল করবেন৷ শ্রী মথুরানন্দের কাছে অভয় পেয়ে রাজা বাড়ি ফিরে এলেন। এবং সত্যি সত্যিই এক বছরের মধ্যেই রানীর কোল আলো করে এলো এক পুত্রসন্তান৷ অভিভূত রাজা জগন্নাথ ঢোল রানীর কাছে প্রকাশ করলেন সেই যাত্রা পথের ঘটনার কথা, মথুরানন্দের সাথে সাক্ষাতের কথা ও প্রভু শ্যামসুন্দরের কাছে তার মনোঃকষ্ট ব্যক্ত করার কথা৷

সব শুনে রানীও অধীর হলেন মথুরানন্দের সাক্ষাৎ লাভ করার জন্য ও প্রভু শ্যামসুন্দরের দর্শন লাভের জন্য৷ দর্শনলাভের পর রানী রাজাকে বলেন তার বড় সাধ, গোঁসাইজি যদি প্রভু শ্যামসুন্দরকে তাদের অঞ্চলে প্রতিষ্ঠা করেন৷ কিন্তু এই মনোবাসনা ভালভাবে মেনে নেননি বিষ্ণুপুরের রাজা হান্বির মল্ল৷ তাঁদের বন্ধুত্বের সম্পর্কে চিড়ও ধরে৷ অবশেষে মথুরানন্দের মধ্যস্থতায় আনুমানিক ১০৩২-৩৩ বঙ্গাব্দে, বর্তমানে ইন্দপুর থানার ব্রজরাজপুর গ্রামে মথুরানন্দ শ্যামসুন্দরকে নিয়ে আসেন। পূর্ব নির্ধারিত মন্দিরে প্রভুকে প্রতিষ্ঠা করেন৷ তবে বর্তমান মন্দিরটি সেটি নয়, বর্তমান মন্দিরটি আনুমানিক ১০৪২ বঙ্গাব্দে স্থাপিত৷

রাজা যেহেতু রাজ্যপরিচালনার ভার ভাইপোর হাতে তুলে দিয়েছিলেন, তাই তিনি প্রভুকে নিয়ে আসার পর, নিজের রাজ্যকে তিন ভাগে ভাগ করেন। ৯ আনা নিজের কাছে রাখেন – সুপুর পরগনা, ৬ আনা ভাইপোকে দান করেন – অম্বিকানগর পরগনা এবং বাকি ১ আনা অংশ মথুরানন্দ গোস্বামীকে দান করেন৷ শ্রী মথুরানন্দ সেই ১ আনা অংশের ( প্রায় ৫৫ টি মৌজা ) বেশির ভাগ স্থানীয় মানুষজনের মধ্যে মধ্যস্বত্ব পদ্ধতিতে বিতরণ করেন৷ সৃষ্টি হয় ব্রজরাজপুর৷

শ্যামসুন্দরের নিত্য সেবার সঙ্গে সঙ্গে সেই থেকেই শুরু হয় নানান উৎসব, যার মধ্যে অন্যতম প্রধান হল এই রাসযাত্রা। রাসযাত্রায় মূলমন্দির থেকে শ্যামসুন্দরকে এক সুন্দর পালকি করে নিয়ে যাওয়া হয় মন্দিরের পশ্চিম দিকে অবস্থিত রাস-মন্দিরে । পালকি ধরেন পার্শ্ববর্তী তেঁতুলিয়া গ্রামের ‘তাঁতি’ সম্প্রদায়ের মানুষ , এবং পালকির সামনে লাঠি হাতে হেঁটে যান তেঁতুলিয়া গ্রামেরই লায়েক ( লাঠিয়াল ) সম্প্রদায়। এই ধারাটি যুগ যুগ ধরেই চলে আসছে৷

তদানীন্তন খাতড়ার রাজা তেঁতুলিয়া গ্রামের লায়েক ও তাঁতি সম্প্রদায়কে যে দায়িত্ব দিয়েছিলেন, তা আজও তাঁরা ভক্তিভরে ও গর্বের সঙ্গে পালন করেন। নিয়ম অনুযায়ী গ্রামস্থ গোস্বামীরা ধারাটি অক্ষুন্ন রেখে আজও চিঠি দিয়ে উৎসবের আগের দিন লায়েক ও তাঁতীদের নিমন্ত্রণ করেন বলে জানা গিয়েছে৷

পার্শ্ববর্তী সমস্ত গ্রামের মানুষজন ছাড়াও এই রাস দেখতে বহু দূর দুরান্ত থেকে মানুষজন এসে ভিড় জমান এই গ্রামে। যাত্রা ও নানান অনুষ্ঠানের অয়োজন করা হয় গ্রামের পক্ষ থেকে। বর্তমানে শ্যামসুন্দরের সেবা সুষ্ঠভাবে পরিচালনা করার জন্য শ্যামসুন্দর সেবা কমিটি তৈরি করা হয়েছে৷

শ্যামসুন্দর সেবাকমিটির সম্পাদক চণ্ডীদাস গোস্বামী বলেন, সারা বছর মন্দিরে নিত্য পুজিত হন শ্যামসুন্দর জিউ। একই সঙ্গে অসংখ্য মানুষ মন্দির ভোগ গ্রহণ করেন। কখনও কখনও সেই সংখ্যাটা কয়েক হাজার পেরিয়ে যায়। দূর দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে ছুটে আসেন। সব মিলিয়ে ব্রজরাজপুর পুণ্যস্থান হিসেবে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে বলেও তিনি জানান।

The post শ্যামসুন্দরের পালকি বওয়ার জন্য আজও তাঁতীদের কাছে চিঠি যায়… appeared first on Kolkata24x7 | Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading online Newspaper.



from Kolkata24x7 | Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading online Newspaper https://ift.tt/2TIEa51
via IFTTT

Comments