শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং তাঁর প্রিয় উত্তরবঙ্গ

গৌতম গুহ রায়

“পায়ে পায়ে ঘোরে আঠা কবিতার কাদার কাঠামো
সুতো ছেড়ে, জুতোর পেরেকে লেগে, পলাশের মতো
একটি কবিতা খুঁজে মরে কবি শান্ত, মুখ বুজে!
(অস্ত্রে গৌরবহীন, একা)

তিনি শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বেঁচে থাকলে আজ ৮৫ হতেন তিনি, জীবদ্দশায় ছিলেন বাংলা কবিতার এক জীবন্ত কিংবদন্তি। এলোমেলো জীবনযাপনে যিনি ছিলেন তীব্র সমালোচিত স্রাষ্ঠা, কিন্তু বাংলা সাহিত্যে প্রবল উপস্থিতি নিয়ে বিরাজমান তিনি ছিলেন এক ধূমকেতু, যাকে অস্বীকার করা আজও অসম্ভব।

শক্তি তখন ৮/৯ বছরের নিতান্ত বালক, মাসির সঙ্গে সিনেমা দেখতে গিয়ে নিউজ-রিলে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর ছবি দেখে হাউহাউ করে কেঁদেছিলেন। ওই বয়সে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে কিচ্ছু না জেনেও অন্তর থেকে কান্না উঠে এসেছিল, সিনেমাটি না দেখেই ফিরে এসেছিলেন। জীবিত নয়, মৃত রবীন্দ্রনাথ এভাবে তাঁর প্রথম দর্শন। তিনি মানতেন রবীন্দ্রনাথ “আমাদের কাছে নিশ্বাস-প্রশ্বাসের মতো তিনি অনিবার্য”।

ব্যক্তিগত স্বীকারোক্তি তাঁর: “আমি যখন মদ্য পান করতে করতে নিজের মধ্য চলে যাই, তখন রবীন্দ্রনাথের গান আমার ভিতর-বাহিরকে একাকার করে দিয়ে যায়, করতে থাকে, তখন গলার সবটুকু জোর ও উদারতা দিয়ে ওঁর গান গাইতে ইচ্ছে করে।”

সেই রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতীতে আমন্ত্রিত অধ্যাপক হিসাবে যুক্ত হয়েছিলেন। ১৯৯৫-এ, ২৩ মার্চ, এই শান্তিনিকেতনে তিনি শেষ নিশ্বাস নেন। এ এক অদ্ভুত সমাপতন। কবিতাকে মাধুকরী করে নিয়ে তিনি ছিলেন সদা অস্থির ও ভ্রাম্যমাণ পথিক, অশান্ত ও সৃষ্টি উন্মাদনায় উৎসর্গিত প্রাণ, যাঁর ছিল মানুষের জন্য দিগন্ত ব্যাপ্ত বুকভরা ভালবাসা।

“এত ভাল বাসেননি কেউ শক্তি যেমন বেসেছিলেন। ভালবেসেছিলেন তিনি মানুষকে, মানুষের ঘর-গেরস্থালিকে, ভালবেসেছিলেন তিনি সংসারছুট অরণ্য প্রান্তর সমুদ্র পাহাড়, প্রকৃতির সঙ্গে মিশে গিয়ে তিনি নিজেই হয়ে উঠেছিলেন প্রকৃতি।…বিষাদমাখা সুন্দরের ডাক জনে-জনে বিলি করে গেছেন এই হরকরা, কবিতাবিমুখ মানুষকেও ফরিয়ে এনেছেন কবিতার দিকে।” শক্তি সম্পর্কে শঙ্খ ঘোষের এই মূল্যায়ন তাঁর অন্তরের এলোমেলো মানচিত্রের কাছে নিয়ে যায়। এজন্যই হয়তো তাঁর প্রথম কবিতার বইয়ের নামের প্রথম শব্দ দুটি ‘হে প্রেম..’।

কৃত্তিবাসে ১৯৫৭তে প্রকাশিত ‘হে প্রেম হে নৈঃশব্দ’-এর বিজ্ঞাপনে লেখা হয়েছিল, ‘বাংলা সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য কবিতার বই’, যে বইয়ের প্রতিটি কবিতাই চাইবাসায় বসে লেখা। কবিতাকে ‘পদ্য’ বলতেন শক্তি, এই ‘হে প্রেম’এর কবিতাগুলো লিখবার সময় সঙ্গী ছিলেন আর এক কৃত্তিবাসী কবি সমীর রায়চৌধুরী।

‘আমি লিখতুম আর ও এমন নিজের মতন করে সেগুলো পড়তো আর এমন যত্নে সেগুলো প্যাটরাবন্দী করতো– তা আমি আজও ভুলতে পারবো না। টিলার উপর সেই, বাড়িটি থেকে পদ্যের অমন ঢল নামা, আমার জীবনে আর কখনো হয়নি।… ওই ‘হে প্রেম’-এর অধিকাংশ পদ্যেই তাই সিংভূমের বনজঙ্গল নদীঝর্ণা আর পাহাড়ে মালার মতন আগুন দেখা যায়। আর, তারই পাশাপাশি দেখা যায় হয়ত কিছু ঘর গেরস্থলির শ্লথ শিথিল ছবি শালের বাহুবন্ধন আর কুরুশকাঁটা।” এমনই তাঁর ‘অনন্ত নক্ষত্রবীথি তুমি, অন্ধকার’-এও দেখি বারংবার কবি তাঁর প্রকৃতি সংলগ্নতার কথা বলেছে।

“অনন্ত নক্ষত্রবীথি-– সমাধির দ্যোতনা তোমার বাহুতেও আছে
মেঘেও পায় না টের-– নীলিমার গভীর আরাম
আমাদের কাছে
বোধ হোয়-– বোধের ওপারে
নিখিল তরণী ভেসে চলে একা মাঝিমাল্লাহীন
দিনরেখা দুস্তর
অনন্ত নক্ষত্রবীথি-– মধ্যে আছে তারই জন্মান্তর।”

এই প্রেম, এই পাহাড় জঙ্গল, এই আগুন চার দশক ধরে বাংলা কবিতায় ছড়িয়ে জড়িয়ে গিয়েছেন শক্তি। ভ্রমণ ছিল কবির যাপনের প্রধান চালিকা শক্তি। এই ভ্রমণের বেশ কিছু অংশ জুড়ে আছে উত্তরবঙ্গ। পাহাড়, নদী, জংগল, গ্রামের হাট, নিস্তব্ধ গাছ তাঁর জীবনের ও যাপনের সঙ্গে জুড়ে গিয়েছিল একসময়।

লিখেছিলেন, ‘কুয়াশায় ঢেকে গেছে সারা পথ, পাহাড়ের চূড়া/ পাইন-ধূপির থেকে জল পড়ে বৃষ্টির মতন/ জোড়বাংলো থেকে আসে ট্রাক নিতে মাংস পাহাড়ের/ হাটের ধুলো কি দূর কাঞ্চনজঙ্ঘায় লেগে আছে?’– এই বিস্ময়ই তাকে অনবরত টেনে এনেছে এই হিমালয়ের কাছে, এর পাদদেশে। “যাব নাকি? ওদেশে এখন/ কাঠবিড়ালির পাশে শুয়ে আছে মন/ ভাঁজ হয়ে ধুলোর উপরে/ কেউ নেই ওদেশের ঘরে/ আলাচাবি/ ওদেশে ফেলেও যেতে পারি”। (অনন্ত নক্ষত্রবীথি)

আমিতাভ দাশগুপ্ত কয়েক বছর জলপাইগুড়িতে আনন্দচন্দ্র কলেজে অধ্যাপনা করেছিলেন। তিনি গদ্যে–পদ্যে ডুয়ার্সকে ছুঁয়েছিলেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায় তখন প্রায় ভবঘুরে। প্রায়ই আসতেন, ঘুরে বেরাতেন ডুয়ার্সের চা-বাগিচায়, গ্রামগঞ্জে। জীবনের শেষ পর্বেও বার বার এসেছেন ডুয়ার্সে, আলিপুরদুয়ার, গয়েরকাটায়, ভূটান পাহাড়ে। প্রায়ই পরের দিকে সঙ্গী ছিলেন দেবকুমার বসু।

শক্তি চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘জঙ্গলের মধ্যে ঘর ঈশ্বর গড়েন’। তিনি প্রচ্ছন্ন স্বদেশ কাব্যগ্রন্থে লেখেন, ‘বৃষ্টিতে ডুয়ার্স খুবই পর্যটনময়’। অথবা ‘মেটেলি চালসার হাটে চলো যাই, পাহাড় পাকিয়ে উঠে চল পথ ঘুরে-ঘুরে-ঘুরে’। আবার লিখেছিলেন, ‘কমলালেবুর বনে এসে গেছি-দূরে খাস মহল/ নিচে মূর্তি নদী খোলে জল/ সারবন্দী নীলগাই ভেসে চলে সর্বদা বারাতে/ এই বনে- বনের পাড়াতে / হঠাৎ এসেছি আমি? নাকি চিরকাল করি বাস / নূতনে স্বাগত করে-– নাকি পাত। মনেরই সন্তান? / … কুঠার পড়ার শব্দ কোলাহল হয়ে বাজে কানে/ মূর্তির ঝর্নায় আছে গান/ লেবুবনে ভ্রমরই শাম্পান/ দুই তীর টানে।” (অনন্ত নক্ষত্রবিথী)

হেমন্তে জন্ম, হেমন্ত তাঁর কবিতায় যেভাবে বারে বারে হানা দেয় অরণ্যও সেভাবেই তাঁকে ঘিরে রাখে। এই কারণেই বারে বারে তাঁর তরাই ডুয়ার্সে আসা। যেখানে তিনি খুঁজে পান ‘ইতস্তত ময়ূর ঘোরে এই অরণ্যে’ যেখানে তাঁর কাছে ‘মেঝেয় পড়ে ভাঙ্গলও মাটি/ আঁধারে, এই বাংলো গভীর-অরণ্যের দাঁত কপাটি’।

উত্তরের, বিশেষত জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, আলিপুরদুয়ারের সঙ্গে শক্তির একটা আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এই সম্পর্কের ভিত ছিল এই অঞ্চলের প্রকৃতি। আদিবাসিদের গ্রামে গ্রামে ঘুরেছেন, রাতে হাড়িয়া খেয়ে ঘুমিয়েছেন এই চা-বাগিচা ও অরণ্যের প্রান্তরেই। সঙ্গী হয়েছিলেন কখনও কোচবিহারের রণজিৎ দেব, কখনও গয়েরকাটার নন্দদুলাল সরকার বা জলপাইগুড়িতে অধ্যাপনার জন্য আসা অমিতাভ দাশগুপ্ত। চিলাপাতা বা খয়েরবাড়ির ভার্জিন অরণ্যে একবার মুখোমুখি হয়েছিলেন বন্য হাতির।

রণজিৎ দেবের কাছ থেকে জানা যায় ভীত হয়ে না পালিয়ে হাতির চোখে চোখ রেখে ছিলেন কবি, হাতি ঘুরে দঁড়িয়ে ধীরে ধীরে ফিরে যায় অরণ্যে। তোর্ষার জলে উদ্যাম কবি স্নান সেরে শুয়ে থেকেছেন বালি চরে। তার কাছে ‘আরোগ্যের জন্য এই সবুজের ভীষণ দরকার/ বহুদিন জঙ্গলে কাটেনি দিন/ বহুদিন জংগলে যাইনি।’ তাঁর বারে বারে এই অরণ্যে পাহাড়ে নদীর কাছে আসার কারণ বোধ হয় নগর কলকাতার কূটচালে ক্লান্ত হয়ে একধরনের পালিয়ে আসা, প্রকৃত শেকড়ের কাছে। লিখেছেন, ‘বড়ো দীর্ঘতম বৃক্ষে বসে আছো দেবতা আমার/ শিকড়ে, বিচ্ছিন্ন প্রান্তে, কান পেতে আছি নিশিদিন’।

The post শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং তাঁর প্রিয় উত্তরবঙ্গ appeared first on Kolkata24x7 | Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading online Newspaper.



from Kolkata24x7 | Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading online Newspaper https://ift.tt/2P15bwZ
via IFTTT

Comments