বিড়লা হাউস থেকে গান্ধী স্মৃতি হয়ে ওঠার কাহিনি
সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়: দিল্লিতে অবস্থিত গান্ধী স্মৃতি নামে যে মিউজিয়ামটি গড়ে উঠেছে সেটি একসময় ছিল দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পগোষ্ঠী বিড়লা পরিবারের বাসস্থান৷ ফলে তা বিড়লা হাউস বা বিড়লা ভবন বলে পরিচিত ছিল৷ এই বাড়িটিতেই জাতির জনক জীবনের শেষ ১৪৪টি দিন কাটিয়েছিলেন৷ এমন কি ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি বিড়লা পরিবারের ওই ভবন চত্বরেই আততায়ীর গুলিতে মৃত্যু হয় মহাত্মার৷
ফলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরু চেয়েছিলেন বাপুজীর স্মৃতি বিজড়িত ওই ভবনেই গড়ে উঠুক তাঁর স্মৃতি মন্দির৷ কিন্তু সেইসময় সে বিষয়ে বাদ সেধেছিলেন গান্ধীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বিড়লা গোষ্ঠীর কর্তা ঘনশ্যাম দাস বিড়লা৷ যিনি জিডি বিড়লা নামেই বেশি পরিচিত ৷ আর এ নিয়ে কিছুটা মতবিরোধ দেখা গিয়েছিল জিডি বিড়লার সঙ্গে নেহরুর৷

১৯২৮ সালে দিল্লিতে ১২ শয্যা বিশিষ্ট ওই বাড়িটি গড়েছিলেন শিল্পপতি ঘনশ্যামদাস বিড়লা৷ বাপুজীর সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক ছিল জিডি-র৷ গান্ধীজী যেমন এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের চালিকা শক্তি তেমনই আবার এই বিড়লা হাউস যেন হয়ে উঠেছিল তাঁর বাড়ি ৷ শুধু গান্ধীজীর নয় ওই বাড়িতে নিয়মিত অতিথি হয়ে আসতেন সর্দার প্যাটেলও৷ অনেক রাজনৈতিক নেতারই সেই সময় আসতে দেখা যেত ওই ভবনে৷
বিশেষত ১৯৪৭ সালের ৯ সেপ্টেম্বর থেকে এই ভবনে বাপুজী থাকার সময় বলতে গেলে জনগণের জন্য অবারিত হয়ে গিয়েছিল বিড়লা পরিবারের বাসভবনটি৷ ফলে ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি গান্ধীজী যখন প্রার্থনা করতে যাচ্ছিলেন তখন নাথুরাম গডসে ঢুকে পড়েছিলেন বাড়িটিতে৷ তিনি এসে প্রথমে তাঁকে প্রণাম করেন, তারপরে অতর্কিতে গুলি চালায় ৷ লুটিয়ে পড়েছিলেন মহাত্মা৷ খুন করা হয়েছিল মহাত্মাকে৷
এই ঘটনার পরে প্রধানমন্ত্রী নেহরু চেয়েছিলেন গান্ধীর স্মৃতি জড়িয়ে থাকা এই বাড়িটিকে জাতীয় সৌধ রূপে গড়ে তুলতে৷ সেই মতো তিনি বিড়লা পরিবারের কাছে প্রস্তাব দেন৷ কিন্তু সেই প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি বিড়লাদের৷ কারণ তারই জবাবে জিডি বিড়লা নেহরুকে লিখেছিলেন, এই বাড়ি স্মৃতির ভাণ্ডার যা তাঁর কাছে একটি বইয়ের মতো হয়ে রয়েছে যা স্মরণ করে তিনি গভীরভাবে উপভোগ করেন৷ ফলে সরকারের পক্ষ থেকে তখন পরামর্শ ছিল যেখানে মহাত্মা নিহত হয়েছিল ভবনের সেই অংশটি গান্ধীজীর স্মৃতিতে হস্তান্তর করা হোক৷
কিন্তু তখন সে প্রস্তাবও মানতে পারেননি জিডি বিড়লা৷ তিনি জবাবে জানিয়েছিলেন, এটা যেন কাউকে বলা হচ্ছে সন্তানকে কেটে দু’ভাগ করে একটি অংশ রেখে দিয়ে অন্য অংশ দিয়ে দিতে বলা৷ তবে ওই জায়গাটা দেওয়ার জন্য বিড়লা পরিবারের উপর অনবরত চাপ দেওয়া হতে থাকে৷ যদিও বল্লভভাই প্যাটেল এইভাবে বাড়িটিকে অধিগ্রহণের বিরোধিতা করেছিলেন৷ তখন তাঁর বক্তব্য ছিল, এমনটা করা মানে গান্ধীজী এবং জিডি বিড়লার অনুভূতিকে মর্যাদা না দিয়ে বরং খারাপ ভাবে জোরজবরদস্তি করা হচ্ছে৷
সময়ের তালে প্রধানমন্ত্রীরও পরিবর্তন হয়েছে এদেশে৷ জহরলাল নেহরু জমানা শেষ হয়ে ইন্দিরা গান্ধীর জমানা শুরু হয়৷ তবে এই বিষয়টি নিয়ে বিড়লা পরিবারের উপর ক্রমাগত চাপ দেওয়ার পাশাপাশি চলছিল ভবনটির দাম নিয়ে দরাদরি করা৷ অবশেষে বিড়লাদের কাছ থেকে সরকার ৫৪ লক্ষ টাকায় এই বাড়িটি কিনে নেয়৷ ১৯৭১ সালের ২ অক্টোবর কিছুটা অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিড়লা ভবনটি গান্ধী সদনে পরিণত করতে তুলে দেওয়া হয় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ভিভি গিরির হাতে৷
তখন জিডি বিড়লার পরিবার ওই বাড়ি ছেড়ে বসন্ত কুঞ্জে একটি ভাড়া বাড়িতে বাস করতে থাকেন, যতদিন না পর্যন্ত অমৃতা শেরগিল মার্গে নতুন বাংলো ‘মঙ্গলম’ গড়ে ওঠে৷ কালের স্রোতে এই বিড়লা হাউসটি জাতীয় সৌধ হিসেবে গড়ে ওঠে এবং নাম হয় গান্ধী স্মৃতি এবং দর্শন সমিতি৷ ১৯৭৩ সালের ১৫ অগস্ট থেকে এই ভবনটি সাধারণের পরিদর্শনের জন্য খুলে দেওয়া হয়৷ সেখানে সংগৃহীত রাখা রয়েছে গান্ধীর জীবন ও মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত নানা সামগ্রী৷ ২০০৫ সালে এখানে গান্ধীকে ভিত্তি করে একটি মাল্টিমিডিয়া মিউজিয়ামের উদ্বোধন করা হয়৷
The post বিড়লা হাউস থেকে গান্ধী স্মৃতি হয়ে ওঠার কাহিনি appeared first on Kolkata24x7 | Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading online Newspaper.
from Kolkata24x7 | Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading online Newspaper http://bit.ly/2RXYDWB
via IFTTT
Comments
Post a Comment