সিরাজ-উদ-দৌলার ঔদ্ধত্যই মীরজাফর, জগৎ শেঠদের তৈরি করেছিল!

বিশেষ প্রতিবেদন: শুধুমাত্র ইতিহাস নয়, বাংলার সাহিত্যেও শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে ‘দ্য ট্র্যাজিক হিরো’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে৷ যেখানে খলনায়কের জায়গাতে রয়েছেন মীরজাফর, রায়দুর্লভ, মাণিকচাঁদ, জগৎ শেঠ, উমিচাঁদরা৷ কিন্তু হঠাৎ কী কারণে বাংলার নবাবের বিরুদ্ধে গেলেন একদা নবাব পরিবারের অনুগত এই ক্ষমতাশীল ব্যক্তিরা?

উত্তর খুঁজতে গেলে কিছুটা পিছনে ফিরে যেতে হয়৷ বিশেষ করে ১৭৩৩ সালে যখন জইনউদ্দিন আহমেদ খান এবং আমিনা বেগমের পুত্র সিরাজ-উদ-দৌলা জন্মেছিলেন৷ দাদু(মায়ের বাবা) আলিবর্দি খাঁ ওই বছরই বিহারের দায়িত্ব পান৷ সে থেকেই সিরাজ আলিবর্দির বিশেষ স্নেহভাজন ছিলেন৷ ১৭৫৬ সালে তাঁর মৃত্যুর পর মাত্র ২৩ বছর বয়সে সিংহাসনে আরোহণ করেন সিরাজ৷ সিংহাসন আরোহণের আগে থেকেই নিজের স্বভাবগত ঔদ্ধত্যের জন্য অনেকের বিরাগভাজন ছিলেন তিনি৷

মুর্শিদ কুলি থেকে আলিবর্দি এক লম্বা সময় ধরে হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে বাংলার নবাবদের উপর আস্থা রেখেছিলেন৷ কিন্তু সিরাজ-উদ-দৌলার হাতে ক্ষমতা আসার আগে থেকেই তাঁর স্বৈরাচারী ব্যবহারের পরিচয় পেতেন হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে বাংলার প্রজারা৷ বিশেষজ্ঞদের মতে আলিবর্দির বিশেষ কাছের হওয়ার সুবাদে যথেষ্ট উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন করতেন সিরাজ৷ বাংলার নবাবের আসনে নিজেকে বসানোর জন্য যে স্বাভাবিক শিক্ষার প্রয়োজন ছিল সেটির প্রতিও আগ্রহ দেখাননি আলিবর্দির এই প্রিয় পৌত্র৷

সিরাজের উচ্ছৃঙ্খল জীবন নিয়ে একাধিক উপকথা ছড়িয়ে রয়েছে৷ সেরকমই একটি হল সিরাজ-উদ-দৌলা এবং পলাশীর যুদ্ধে তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত সেনাপতি মোহনলালের সম্পর্ক নিয়ে৷ প্রচলিত উপকথা অনুসারে মোহনলালের বোনের রূপে মুগ্ধ সিরাজ প্রায়ই মুর্শিদাবাদে তাদের বাড়িতে যেতেন৷

সিরাজ এবং মোহনলালের বোনের মধ্যে সম্পর্কের দরুন তাদের একটি সন্তানও হয়৷ তখন আলিবর্দি বেঁচে ছিলেন। তাই সিরাজ পুরো ব্যাপারটি গোপন রেখেছিলেন৷ পরে বড় ছেলে তাকে ঘোরাতে নিয়ে যাওয়ার নাম করে হত্যারও চেষ্টা করেছিলেন৷ কিন্তু আলিবর্দির মধ্যস্থতায় সিরাজ ও মোহনলালের বোনের বিয়ে হয়৷ ইসলাম গ্রহণ করার পর মোহনলালের বোনের নাম হয় লুৎফুন্নেসা বেগম৷ যদিও এই গল্পের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়৷

নবাবের উচ্ছৃঙ্খল চরিত্রের প্রমাণ পাওয়া যায় কাশীমবাজারের এক ফ্রেঞ্চ বণিক জঁ ল(monsieur jean law)-এর একটি বর্ণনা থেকে৷ সিরাজ সম্পর্কে ল লিখেছেন, ‘‘চরিত্রের দিকে থেকে আমার দেখা সবচেয়ে খারাপ নবাব ছিলেন সিরাজ-উদ-দৌলা৷ অদ্ভুত এক নৃশংসতা উপভোগ করার প্রবণতা ছিল ওনার মধ্যে৷ গঙ্গার ঘাটে স্নানরত হিন্দু মেয়েদের লোক পাঠিয়ে নৌকা করে তুলে আনাতেন নিজের হারেমে৷ বন্যার সময় মাঝ গঙ্গায় সাধারণ মানুষ ভর্তি নৌকাডুবি দেখে মজা পেতেন৷ জলে ডুবতে চলা হাজারও মানুষের আর্তনাদ ওনাকে কেমন এক পৈশাচিক আনন্দ দিত৷’’
(তথ্যসূত্র ইন্টারনেট)

এছাড়াও নবাবের অধীনস্থ দেওয়ানদের সঙ্গে আলিবর্দি খাঁয়ের মতো সুসম্পর্ক রাখতেও ব্যর্থ ছিলেন সিরাজ৷ পলাশির যুদ্ধে সিরাজের পতনের পেছনে থাকা সবচেয়ে বড় চরিত্রটি হল মীরজাফর৷ আলিবর্দির সময়ই পারস্য থেকে নিঃস্ব অবস্থায় ভাগ্যান্বেষণে বাংলায় আসেন তিনি এবং বিহারের নায়েব আলিবর্দি খানের অধীনে কর্মজীবন শুরু করেন।

১৭৪০ সালে সংগঠিত গিরিয়ার যুদ্ধে মীর জাফর আলিবর্দি খানের হয়ে নবাব সরফরাজ খানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন এবং খ্যাতি লাভ করেন। আলিবর্দি নবাব হওয়ার পর মীর জাফরকে তাঁর কৃতিত্বের জন্য মনসবদার পদ প্রদান করেন এবং মীর জাফরের বেতন হয় মাসে ১০০ টাকা। নবাব আলিবর্দি তাঁর বৈমাত্রেয় বোন শাহ খানুমকে মীর জাফরের সঙ্গে বিবাহ দেন।

পরবর্তীতে মীর জাফর নবাবের পুরাতন সৈন্যদলের প্রধান ‘বখশী’ বা প্রধান সেনাপতির পদ লাভ করেন। কিন্তু নবাবের সিংহাসনে বসার সময় থেকেই সিরাজের সঙ্গে মীরজাফরের বিবাদ শুরু হয়েছিল৷ এর মূলত দুটি কারণ ছিল, ১-আলিবর্দির কাছের এবং গিরা থেকে মারাঠাদের সঙ্গে যুদ্ধে নিজেকে প্রমাণ করা মীরজাফর নিজেকে সিংহাসনের যোগ্য দাবীদার মনে করতেন৷ ২- যোগ্যতা অনুসারে মীরজাফরের প্রাপ্য সম্মানটুকুও দিতে রাজী ছিলেন না সিরাজ৷

বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপিকা তনভীর নাসরীন-এর এই প্রসঙ্গে বক্তব্য, সিরাজ-উদ-দৌলা কম বয়সে সিংহাসনে বাংলার মসনদে আরোহণ করে ছিলেন৷ তার কাছ থেকে যে দূরদর্শিতার প্রয়োজন ছিল তা তিনি দেখাতে পারেননি৷ উনি উপলব্ধি করতে পারেননি যে পলাশির আমবাগানে ওঁর বিপক্ষে অপেক্ষা করে রয়েছে ইংরাজদের মতো প্রতিপক্ষ৷ অল্প বয়সে ক্ষমতা হাতে পাওয়ায় ওঁর চরিত্রে স্বভাব ঔদ্ধত্য ছিল৷ যার ফলে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যারা ওঁর পক্ষ নিতে পারত তারাই বিপক্ষে চলে যায়৷

মোঘল সম্রাট আকবরও খুব অল্প বয়সে দিল্লির তখথে বসেছিলেন৷ কিন্তু তাঁর দূরদর্শিতার অভাব ছিল না৷ তিনি ভালো লোকদের গুরু হিসেবে পেয়েছিলেন৷ যারা প্রথাগত শিক্ষাহীন আকবরকে ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক হওয়ার শিক্ষা দিতে পেরেছিলেন৷ এই শিক্ষা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত ছিলেন সিরাজ-উদ-দৌলা৷

(ইন্টারনেট ও বিভিন্ন বই থেকে তথ্য নিয়ে অনুলিখনে শেখর দুবে)

The post সিরাজ-উদ-দৌলার ঔদ্ধত্যই মীরজাফর, জগৎ শেঠদের তৈরি করেছিল! appeared first on Kolkata24x7 | Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading online Newspaper.



from Kolkata24x7 | Read Latest Bengali News, Breaking News in Bangla from West Bengal's Leading online Newspaper http://bit.ly/2GUOwN4
via IFTTT

Comments